শনিবার, ২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,৭ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

ইরানের সামরিক শক্তি ও হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব কমাতে কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলা

যায়যায়কাল ডেস্ক: ইরানের কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার কথা স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে হামলাকে ‘সীমিত’ আখ্যা দিয়ে তিনি দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর ছোট পরিসরে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।

তিনি বলেন, ‘আমরা ছোটখাটো হামলা চালাই। তারা একটি বিমানবিধ্বংসী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছিল। আমরা সেটি প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে, হয়তো পাঁচ মিনিটেই ধ্বংস করে দিয়েছি।’

ট্রাম্পের এ বক্তব্যের কিছুক্ষণ আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপের সুজা এলাকায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি দেশটির সেনাবাহিনীর বরাত দিয়ে আরও জানায়, কেশম দ্বীপের আকাশসীমায় একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন শনাক্ত করে ভূপাতিত করেছে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাবাহিনী।

কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের খবর প্রকাশের পর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থা ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত রয়েছে। আলজাজিরাকে সেন্টকমের এক কর্মকর্তা বলেন, তারা এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি।

এদিকে শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্যের জন্য সর্বোচ্চ দুই কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে সেন্টকম। পাশাপাশি তথ্যদাতাদের সম্ভাব্য পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়ার কথাও জানানো হয়। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, সরঞ্জাম, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বিজ্ঞানীদের বিষয়ে তথ্য চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এর আগে সোমবার কেশম দ্বীপে একাধিক বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ করেছিল ইরানের গণমাধ্যম। একই সময়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী ‘প্রতিরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা অব্যাহত

শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেন, ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের আলোচনা চলছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা এখন তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি। তারা একটি চুক্তি করতে চায়।’

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে আমাদের অনেক অগ্রগতি হয়েছে।’ তবে আলোচনার অগ্রগতি বা সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে—এমন খবর প্রত্যাখ্যান করেছে কাতার। শনিবার কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, এ ধরনের দাবি শুধু তাদেরই উপকারে আসে, যারা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়াতে চায়।

শুক্রবার অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক উন্মুক্ত আলোচনায় কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জসিম আল থানি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সংকটটি অমীমাংসিত অবস্থায় ফেলে রাখা যায় না বলেও সতর্ক করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমরা মার্কিন প্রশাসনের সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে তাদের আন্তরিক উদ্যোগ রয়েছে।’

সংঘাত যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়, সে জন্য মধ্যস্থতার চেষ্টা চলছে জানিয়ে কাতারের প্রধানমন্ত্রী বলেন, তেহরানের কিছু বিচক্ষণ ব্যক্তির ভূমিকার কারণেও পরিস্থিতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের দিকে এগোয়নি।

হামলার হুমকি ও সামরিক প্রস্তুতি

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়ার পর শুক্রবারের হামলাকে ইরানে নতুন করে সামরিক তৎপরতার প্রথম ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের ফলাফলের জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছিলেন ট্রাম্প।

নির্বাচনের পর থেকে ইরানকে একদিকে সামরিক হামলার হুমকি দিচ্ছেন, অন্যদিকে যুদ্ধের অবসান কাছাকাছি বলে ইঙ্গিত দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ইরানের বাকি অংশও ‘ধ্বংস’ করতে হতে পারে। এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা শিগগিরই জানা যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে বুধবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেন্টাগনের কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডারদের বরাত দিয়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ট্রাম্পের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটিতে এবং এক ডজনের বেশি যুদ্ধজাহাজে হাজার হাজার মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনীর সদস্যকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর ইঙ্গিতের মধ্যে তেহরানও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। ফলে একদিকে সামরিক উত্তেজনা, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনা—দুইয়ের মধ্য দিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ