
যায়যায়কাল প্রতিবেদক: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতাদের অন্যতম সামান্তা শারমিন।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক জোট, নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থানের অস্পষ্টতা এবং নারীবিরোধী রক্ষণশীল প্রবণতার সঙ্গে দলের অবস্থান মিলে যাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি দল ছেড়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান সামান্তা। দলের পুনর্গঠিত কমিটিতে পদাবনতি হওয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় তার এই সিদ্ধান্ত এল।
সামান্তা শারমিনের অভিযোগ, নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে না পারায় এনসিপি ক্রমেই জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের এই দলকে এখন বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের জন্য প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে।
এ ছাড়া বড় একটি রাজনৈতিক দলের ‘লেজুড়’ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত এনসিপির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছে বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, দলের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নারীবিরোধী রক্ষণশীল প্রবণতার সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে। কাউন্সিল ছাড়াই দলের কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক পোস্টে পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে সামান্তা শারমিন বলেন, এসব বিষয়ে বারবার পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হলেও এনসিপি তার রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তনে আগ্রহ দেখায়নি। এ পরিস্থিতিতে দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করে সামান্তা শারমিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বলেন, বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে হোয়াটসঅ্যাপে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। পাশাপাশি দলের গ্রুপেও সবাইকে পদত্যাগের বিষয়টি জানিয়েছেন।
যেভাবে এনসিপিতে যুক্ত হয়েছিলেন সামান্তা
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সামান্তা শারমিন। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশের সময় দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পান তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ডিসেম্বরে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপি জোটবদ্ধ হওয়ার পর থেকে দলীয় কর্মকাণ্ডে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন সামান্তা। সর্বশেষ গত ২৩ অক্টোবর দলের পুনর্গঠিত কমিটিতে তাকে যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত
এনসিপি ছাড়ার পর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন সামান্তা শারমিন।
তার মতে, তরুণদের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা, যেখানে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে এবং বিভাজন রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে না।
ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, মানুষ তরুণদের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এমন একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাশায়, যারা পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর পুনরাবৃত্তি করবে না; বরং নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাজনীতির পথ তৈরি করবে।
সামান্তার ভাষায়, গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নগুলো এখনো নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি আরও লিখেছেন, বাংলাদেশের তরুণদের এমন একটি রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মতাদর্শের পার্থক্য থাকলেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অভিন্ন লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হবে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থাকবে, তবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে কোনো বিদেশি শক্তির অবস্থান গ্রহণযোগ্য হবে না।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে তরুণসমাজকে নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তার মতে, নতুন এই উদ্যোগ অতীতের কোনো রাজনৈতিক দলের পুনরাবৃত্তি না হয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের নতুন প্রচেষ্টা হওয়া উচিত।
এ ধরনের রাজনৈতিক উদ্যোগে যুক্ত হতে আগ্রহীদের সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময় করতে চান সামান্তা। এ বিষয়ে আগ্রহীদের যোগাযোগের আহ্বান জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি আপনাদের সঙ্গে নিয়েই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তৈরির প্রকল্পকে এগিয়ে নিতে চাই।’











