শুক্রবার, ২১শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,৬ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সিএমপির এসআই সৈয়দ আলমের বিরুদ্ধে ইয়াবা সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততা ও দুর্নীতির অভিযোগ

মো. শফিকুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বাকলিয়া থানায় কর্মরত উপ-পরিদর্শক (এসআই নিরস্ত্র) সৈয়দ আলমের বিরুদ্ধে মাদক সিন্ডিকেটের সাথে গভীর যোগাযোগ, মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ব্ল্যাকমেইল এবং প্রায় আড়াই কোটি টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ও চরম বিতর্কিত এই পুলিশ কর্মকর্তার একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্যে এলাকায় চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা সৈয়দ আলম (বিপি নং ৭১৯১০৫২০৫১), কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার বাসিন্দা। তার বাবার নাম মো. জামান এবং মায়ের নাম মৃত মালেকা বেগম। ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি সিএমপির বাকলিয়া থানায় যোগদান করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর বাকলিয়া থানায় যোগদানের পূর্বে উপ-পরিদর্শক(এসআই) সৈয়দ আলম সিএমপি’র ডবলমুরিং থানায় কর্মরত ছিলেন। ডবলমুরিং থানায় থাকা অবস্থায়ও তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হয়রানি, অন্যায়ভাবে অর্থ আদায় ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অসংখ্য গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। সেই সময়কার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই বাকলিয়া থানায় যোগদানের পর তাঁর অপরাধের পরিধি ও বেপরোয়া ভাব আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, এসআই সৈয়দ আলমের স্থায়ী বাড়ি মাদক চোরাচালানের প্রধান রুট ও ট্রানজিট পয়েন্ট কক্সবাজার জেলায় হওয়ায় তিনি স্থানীয় ও আঞ্চলিক ইয়াবা সিন্ডিকেটের সাথে একটি শক্তিশালী চোরাচালান নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। কক্সবাজারের ভৌগোলিক অবস্থান, আঞ্চলিক পরিচিতি ও নিজের পুলিশি পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বড় বড় মাদক কারবারিদের সেফ-প্যাসেজ, আগাম তথ্য প্রদান ও প্রশাসনিক বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করে আসছেন। টেকনাফ ও কক্সবাজার থেকে আসা মাদকের চালান নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে তাঁর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

অভিযুক্ত কর্মকর্তার এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিএমপির একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এসআই সৈয়দ আলমের এ ধরনের অপকর্ম ও মাদক সিন্ডিকেটের সাথে দহরম-মহরমের বিষয়টি বাহিনীর ভেতরেও অনেকের জানা। কতিপয় এমন নীতিহীন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অপরাধ ও অর্থলিপ্সার কারণে গোটা পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ও সততা আজ চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করা সৎ অফিসারদের সুনামও এতে ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে তারা মন্তব্য করেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তারা।

ডবলমুরিং থানার পর বর্তমান কর্মস্থল বাকলিয়া থানায়ও সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত হয়রানি ও জিম্মি করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। কোনো একটি ঘটনা বা অপরাধ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও, এলাকার নিরীহ জনগণকে জোরপূর্বক ডিক্লারেশন বা বিভিন্ন সাজানো মামলায় সাক্ষী বানানোর জন্য ভয়াবহ চাপ প্রয়োগ করেন তিনি। এতে রাজি না হলে বা তাঁর দাবি পূরণ না করলে সাধারণ মানুষকে মাদক মামলাসহ বিভিন্ন গুরুতর মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার প্রকাশ্য হুমকি দেন। তাঁর এই অনৈতিক ব্ল্যাকমেইলিং ও মামলার ভয়ে এলাকার সাধারণ ও শ্রমজীবী মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।

মাদক সিন্ডিকেটের নিয়মিত মাসোহারা, ডবলমুরিং ও বাকলিয়া থানায় থাকাকালীন মামলার ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি ও উপর মহলের নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এসআই সৈয়দ আলম কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। বর্তমানে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার কুঞ্জ ছায়া আবাসিক এলাকায় একটি ফ্ল্যাট সহ তার নামে এবং বেনামে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকের সঞ্চয়পত্র, জমি ও অন্যান্য সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা। একজন সাব-ইন্সপেক্টরের সরকারি স্কেলের বৈধ আয়ের সাথে এই বিপুল পরিমাণ দৃশ্যমান ও অদৃশ্য বিলাসবহুল জীবনযাপনের কোনো সামঞ্জস্য নেই, যা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের পরিপন্থী।

একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর দায়িত্ব থেকে এভাবে প্রকাশ্য মাদক সিন্ডিকেটের সাথে জড়িয়ে পড়া এবং অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা আইন ও নৈতিকতার চরম লঙ্ঘন। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দাবি, একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন দেশবিরোধী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে অনতিবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ ও বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা একান্ত জরুরি। এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অপরাধের শেকড় কতদূর বিস্তৃত এবং এর পেছনে আর কারা জড়িত, তা এই বিশেষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বের করে দ্রুত বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশ বাহিনীর কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার এমন অপকর্মের কারণে গোটা বাহিনীর ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাই এই দুর্নীতিবাজ ও মাদক সিন্ডিকেটের সহযোগী পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং তাঁর অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের জন্য ভুক্তভোগী জনগণ ও সচেতন মহল পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছে।

এসব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত বাকলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সৈয়দ আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এমনকি বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তার ব্যক্তিগত নম্বরে দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, যার ফলে এই গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে তার বক্তব্য বা কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

, বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ