
যায়যায়কাল প্রতিবেদক: বাংলাদেশে ব্যবসা, বিনিয়োগ, চাকরি কিংবা অন্যান্য বৈধ কাজে আসছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিক। তাদের বড় একটি অংশ বৈধভাবেই কাজ করছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে অবস্থানরত কিছু চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ সাইবার অপরাধ, অনলাইন জুয়া, অবৈধ ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন, ভিওআইপি ব্যবসা এবং অর্থপাচারের মতো গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এসেছে।
২০২৬ সালে ঢাকায় একাধিক অভিযানে চীনা নাগরিকদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ কি আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্রের নতুন অপারেশনাল ঘাঁটিতে পরিণত হচ্ছে?
এক অভিযানে ছয় চীনা নাগরিক
চলতি বছরের ১৪ মে রাজধানীর উত্তরা ও তুরাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছয় চীনা নাগরিকসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের অভিযোগ ছিল—তারা অনলাইন জুয়া, সাইবার প্রতারণা এবং অবৈধ ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত।
অভিযানে শতাধিক সিম কার্ড, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন এবং GSM Gateway উদ্ধার করার কথা জানায় পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তা বিদেশে পাচার করত।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ দাবি করে, চক্রটি নিজেদের জুয়ার পোর্টাল পরিচালনার পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা বিদেশে, বিশেষ করে চীনে পাচার করছিল।
বসুন্ধরায় ‘এক ভবনে’ চীনা ভাড়াটিয়া
এর কয়েক মাস পর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আরও একটি ঘটনা সামনে আসে। ডিবি সেখানে অভিযান চালিয়ে তিন চীনা নাগরিক ও একজন বাংলাদেশি নারীকে গ্রেপ্তার করে।
পুলিশের অভিযোগ, চক্রটি অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল প্রতারণা এবং অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। অভিযানে GSM Gateway ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানানো হয়।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি মাত্র গেটওয়ের মাধ্যমে চক্রটি মাসে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে জুয়া ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করত বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের হোটেল থেকে ১,৯৩৮টি আইফোনসহ ছয় চীনা নাগরিক গ্রেপ্তার
কক্সবাজার শহরের একটি হোটেল থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপ ও যোগাযোগ সরঞ্জামসহ চীনের ছয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগে করা মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত শহরের হোটেল সি-প্যালেসে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরে শুক্রবার বিকেলে তাদের কক্সবাজার আমলি আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান বলেন, রামু থানায় করা একটি অভিযোগের সূত্র ধরে ঢাকার পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হোটেলটিতে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ছয় চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন ও ৪০টি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি পুলিশের ব্যবহৃত যোগাযোগ সরঞ্জামের মতো কিছু সামগ্রীও পাওয়া গেছে।
রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে ফজলুল হক বলেন, অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগে শুক্রবার পুলিশ বাদী হয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনে করা মামলায় ওই ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তত দুই মাস ধরে চীনা ও তাইওয়ানি কিছু নাগরিক কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের দুটি হোটেল ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় ছয় চীনা নাগরিকের বিরুদ্ধে রামু থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে। মামলায় তাদের অনলাইন প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে।
রামু থানার ওসি এ কে ফজলুল হক বলেন, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অভিযোগগুলো কেবল প্রচলিত অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে যে অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে—
১. অনলাইন জুয়া
বাংলাদেশে নিষিদ্ধ অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা, স্থানীয় ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে লেনদেনের অভিযোগ।
২. সাইবার প্রতারণা
অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ।
৩. অবৈধ ডিজিটাল লেনদেন
বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর এবং বৈধ আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে লেনদেন পরিচালনার অভিযোগ।
৪. অবৈধ ভিওআইপি
GSM Gateway ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কল ও যোগাযোগব্যবস্থার অবৈধ ব্যবসার অভিযোগ।
৫. অর্থপাচার
অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বাংলাদেশ থেকে বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ।
প্রযুক্তিই হয়ে উঠেছে অপরাধের অস্ত্র
বসুন্ধরার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে যে ধরনের প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম এসেছে, তা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
একাধিক সিম, GSM Gateway, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন এবং বিভিন্ন সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে একটি চক্র একই সঙ্গে অনলাইন জুয়া, যোগাযোগ এবং অর্থ লেনদেন পরিচালনা করতে পারে।
এ ধরনের কাঠামো অপরাধীদের প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে গোপনে কাজ করার সুযোগ দেয়।
বাংলাদেশের বাইরে আন্তর্জাতিকভাবেও সাইবার প্রতারণা এখন বড় ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধে পরিণত হয়েছে। ইন্টারপোলের ২০২৬ সালের একটি বৈশ্বিক অভিযানে ৯৭টি দেশ ও অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে ৫,৮১১ জনকে গ্রেপ্তার এবং প্রায় ২৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অবৈধ সম্পদ জব্দ বা আটকের কথা জানানো হয়েছে।










