মঙ্গলবার, ১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ,৩রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৫০ বছর বয়সে রুবেল চৌধুরীর স্নাতক ডিগ্রি অর্জন

কাজী আল আমিন, বিজয়নগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া): ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর ইউনিয়নের খোদে হাড়িয়া গ্রামের চৌধুরী বাড়িতে জন্ম নেওয়া রুবেল চৌধুরী অধ্যবসায় ও দৃঢ় সংকল্পের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১৯৭৪ সালের আগস্টে জন্ম নেওয়া এই সংগ্রামী মানুষটি প্রমাণ করেছেন সময় পেরিয়ে গেলেও স্বপ্ন কখনো বিলীন হয় না।

শৈশবে প্রতিবন্ধকতায় ১৯৮৭ সালের আগস্টে, ষষ্ঠ শ্রেণিতেই থেমে যায় পড়াশোনা তখনই মায়ের মৃত্যু জীবনে নেমে আনে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তা। অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে। ফলে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। ১৯৯২ সালে এস এস সি পরীক্ষার্থী হয়েও নানা প্রতিকূলতায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সংসার, প্রবাস ও অপূর্ণ স্বপ্ন ১৯৯৫ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। এক ছেলে ও তিন মেয়ের জনক রুবেল চৌধুরী জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ সময় প্রবাসে কাটিয়েছেন। কিন্তু অন্তরের গভীরে লালন করেছেন অপূর্ণ শিক্ষাজীবনের স্বপ্ন।

২০২০ সালে ছেলের গ্রাজুয়েশন তাকে কঠিনভাবে অনুপ্রাণিত করে। ২০২৩ সালে মেয়েও উচ্চশিক্ষার পথে অগ্রসর হয়—যা তার জন্য ছিল অনুপ্রেরণার নতুন আলো।

অদম্য প্রত্যাবর্তন দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৮ সালে তিনি অসমাপ্ত এস এস সি পরীক্ষা পাস করেন। ২০২০ সালে এইচ এস সি সম্পন্ন করেন। প্রতি বছর ছুটিতে দেশে ফিরে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে—কখনো কর্মব্যস্ততা, কখনো পারিবারিক দায়িত্ব, আবার কখনো আর্থিক সীমাবদ্ধতা ছিল বড় বাধা।

অবশেষে ২০২২ সালে দেশে স্থায়ীভাবে ফিরে এসে ২০২৬ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রায় ৫০ বছর বয়সে এ অর্জন।

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া খোদে হাড়িয়া গ্রামের নুরধন ভূঁইয়া বলেন, “প্রায় ৫০ বছর বয়সে লেখাপড়া করে ডিগ্রি অর্জন করা নিঃসন্দেহে বিশাল একটি চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। এ অর্জন সত্যিই আমাদের গ্রামের জন্য গর্বের।”

স্থানীয় বাসিন্দা হারুনুর রশিদ বলেন, “এ ব্যতিক্রমী অর্জন জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা উচিত। এমন সংগ্রামী মানুষের কাহিনি সমাজকে অনুপ্রাণিত করবে।”

উপজেলা শিক্ষা অফিসার বলেন, “যে মানসিক দৃঢ়তা ও অধ্যবসায় নিয়ে তিনি শিক্ষাজীবনে ফিরে এসেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমরা চাই তাঁর মতো আরও অনেকে সামনে এগিয়ে আসুক।”

চম্পকনগর কলেজের প্রিন্সিপাল আব্দুস সাত্তার সরকার বলেন, “দীর্ঘ বিরতির পর পড়াশোনায় ফিরে এসে স্নাতক সম্পন্ন করা সহজ কাজ নয়। তাঁর এ সাফল্য প্রমাণ করে ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই অতিক্রমের বাইরে নয়।”

বিজয়নগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাছিবুর রহমান বলেন, “রুবেল চৌধুরীর এই অর্জন প্রমাণ করে যে শিক্ষা গ্রহণের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। তাঁর এ সাফল্য তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে।”

রুবেল চৌধুরীর জীবনগাঁথা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি অধ্যবসায়, দায়িত্ববোধ ও অদম্য মানসিক শক্তির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি দেখিয়েছেন— “শিক্ষা কখনো বয়স দেখে না; স্বপ্ন কখনো সময়ের কাছে হার মানে না।”

আজ তিনি শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো বিজয়নগর উপজেলার গর্ব। তার শিক্ষাযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবন মানেই লড়াই, আর লড়াই মানেই সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

, বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *