সোমবার, ১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,২রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

তাহসিফ সাউরির মৃত্যু ও আমাদের দায়

মোঃ আব্দুর রহমান: একটি মরদেহ, একটি মোবাইল ফোন, একটি মোটরসাইকেল—আর অসংখ্য প্রশ্ন। বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যু এখন শুধু একটি পরিবারের শোকের বিষয় নয়; এটি তদন্তের স্বচ্ছতা, রাষ্ট্রের জবাবদিহি এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। একজন তরুণের মৃত্যু কীভাবে হলো, এর পেছনে কোনো অপরাধ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা তাঁর পরিবারের অধিকার, একই সঙ্গে তা জনস্বার্থেরও বিষয়।

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। পরিবারের ভাষ্য, ২৮ অক্টোবর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাঁর মুঠোফোন থেকে মাকে ‘আসছি’ লেখা একটি বার্তা পাঠানো হয়। সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তাঁর শেষ যোগাযোগ। ওই দিন বিকেলে ঢাকার তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরদিন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে রাসায়নিক পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে। তবে সুরতহাল প্রতিবেদন মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করে না। এটি মরদেহের বাহ্যিক অবস্থার প্রাথমিক বিবরণ মাত্র। ফলে এ তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী করা কিংবা মৃত্যুর ধরন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপ এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।

তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ৩০ অক্টোবর রাতে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। পরে দ্বীপকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ৩১ অক্টোবর আদালত তাঁকে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া বা রিমান্ডে থাকা অপরাধ প্রমাণের সমান নয়। তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অপরাধের দায় নির্ধারিত হবে।

ঘটনার রাতের বিষয়ে দ্বীপের বক্তব্য এবং পরিবারের বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ অমিল রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বক্তব্যে দ্বীপ দাবি করেছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় কয়েকজন তাঁদের ধাওয়া করলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। অন্যদিকে তাহসিফের বাবা এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, ছেলে সাঁতারে দক্ষ ছিলেন। ধাওয়ার ঘটনা, সেখানে পুলিশের উপস্থিতি এবং নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার দাবির পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে, তা তদন্তে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কারণ, ঘটনার প্রত্যক্ষ বিবরণ হিসেবে প্রচারিত কোনো বক্তব্যকেই যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া যায় না।

মোটরসাইকেল উদ্ধারের ঘটনাও তদন্তে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দ্বীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি কালো সুজুকি জিক্সার মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পিবিআই। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দ্বীপ মোটরসাইকেলটি তাহসিফের বলে শনাক্ত করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মোটরসাইকেলটির মালিকানা, সেখানে সেটি কীভাবে গেল এবং ঘটনার রাতে এর ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া দরকার। সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিমধ্যে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড, কেউ আত্মহত্যা, আবার কেউ দুর্ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

তাহসিফের অতীত কর্মজীবনকেও কেউ কেউ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের একটি ভিডিওর সঙ্গে যুক্ত করছেন।

এ বিষয়ে তাহসিফের বক্তব্য, পরিবারের দাবি এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাঁর চাকরি থেকে বিদায় নেওয়ার বিষয়েও ‘অবসর’ ও ‘চাকরিচ্যুতি’—দুই ধরনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ফলে এসব বিষয়কে একক কোনো ব্যাখ্যায় দাঁড় করানোর আগে নির্ভরযোগ্য নথি ও প্রমাণ প্রয়োজন। অতীতের কোনো ঘটনা বা ব্যক্তিগত জীবনের তথ্যের সঙ্গে মৃত্যুর কারণের যোগসূত্র আছে—এমন সিদ্ধান্তও প্রমাণ ছাড়া টানা উচিত নয়।

এখানে গণমাধ্যমের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের বক্তব্য, পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্ত ব্যক্তির দাবি এবং সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য—সবকিছুকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। কোনটি অভিযোগ, কোনটি বক্তব্য, কোনটি তদন্তে পাওয়া তথ্য আর কোনটি প্রমাণিত সত্য—তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা জরুরি। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় অসমর্থিত তথ্যকে নিশ্চিত সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করলে তা শুধু জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ায় না, তদন্তের পরিবেশকেও প্রভাবিত করতে পারে।

এখন প্রয়োজন তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ও রাসায়নিক পরীক্ষার ফল দ্রুত সংগ্রহ ও প্রকাশ করা দরকার। মোটরসাইকেলের মালিকানা, মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য, ঘটনাস্থল এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ—সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে হবে। সম্ভাব্য সাক্ষীদের বক্তব্য যাচাইয়ের পাশাপাশি তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তির আইনি অধিকার রক্ষা করাও জরুরি। তদন্তের স্বচ্ছতা মানে শুধু তথ্য প্রকাশ নয়; নিরপেক্ষভাবে সব সম্ভাবনা যাচাই করাও।

আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানি না, তাহসিফ সাউরির মৃত্যু দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, নাকি হত্যাকাণ্ড। এই প্রশ্নের উত্তর অনুমান, আবেগ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। দিতে হবে নির্ভরযোগ্য তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে। কারও অপরাধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাঁকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আর অন্য কোনো কারণ প্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।

একটি পরিবারের কাছে প্রিয়জনের মৃত্যুর কারণ জানা এবং ন্যায়বিচার পাওয়া সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় তদন্তব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করাও জরুরি। সত্য প্রকাশের আগে কাউকে দোষী ঘোষণা করা যেমন অন্যায়, তেমনি তদন্তে অযথা বিলম্বও গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা গুজব নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য চাই। তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটিত হোক, তাঁর পরিবার ন্যায়বিচার পাক—এটাই প্রত্যাশা। লেখক: সম্পাদক, সাহিত্যপাতা।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ