বুধবার, ৭ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,২২শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সরাইলে মেঘনার ভয়াল ভাঙনে বিলীন ঘরবাড়ি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ঝুঁকিতে ৪ গ্রামের শতাধিক পরিবার

0-4064x3048-0-0-{}-0-12#bokehtype:0#;ts:503317214758000;appts:1784462340055;qlty:1;;illum:2 scene:0 humanIn:0;

এস. এম. পারভেজ আলম আদেল, স্টাফ রিপোর্টার: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নে মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙন আবারও জনজীবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।

নদীর অব্যাহত ভাঙনে ইতোমধ্যে শতাধিক বসতঘর, প্রায় ২০টি চাতালকল এবং বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

বর্তমানে পানিশ্বর বাজারসহ প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় পালপাড়া, শাখাইতি, দেওবাড়িয়া ও লায়ারহাটি গ্রামের শতাধিক পরিবার চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মেঘনা নদীর পূর্ব তীরে একের পর এক বসতবাড়ি, মসজিদ, চাতালকল ও কৃষিজমি নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে। নদীর তীব্র স্রোতে প্রতিনিয়ত মাটি ধসে পড়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ওসমান মিয়া ও আখতার মিয়ার চাতালকলসহ প্রায় ২০টি চাতালকল এবং শতাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গত কয়েক বছরে ভাঙনের কারণে বহু পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বসতি গড়তে বাধ্য হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা কাউছার মিয়া, আবদুল কুদ্দুস মেম্বার, ওসমান মিয়া, সুমন মুন্সী মেম্বার ও মোবারক মেম্বার বলেন, ছোটবেলা থেকেই তারা প্রতিবছর নদীভাঙনের নির্মম চিত্র দেখে আসছেন। তাদের দাবি, মেঘনার বাম তীরে দ্রুত একটি স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ না হলে অচিরেই পুরো এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পানিশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. তৌহিদ মিয়া বলেন, “পালপাড়া, শাখাইতি, শোলাবাড়ি ও দেওবাড়িয়া গ্রামের কয়েকশ পরিবার বর্তমানে নদীভাঙনের সরাসরি ঝুঁকিতে রয়েছে। একসময় এ এলাকায় অর্ধশতাধিক চাতালকল ছিল। ইতোমধ্যে প্রায় ২০টি চাতালকল ও শতাধিক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ইউনিয়নবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, এখানে একটি স্থায়ী ও টেকসই নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হোক।”

পানিশ্বরের বাসিন্দা ও সরাইল উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান হানিফ আহমেদ সবুজ বলেন, “টানা তিন দশকের বেশি সময় ধরে পানিশ্বরের মানুষ নদীভাঙনের শিকার। একসময় এ অঞ্চল সরাইলের অন্যতম সমৃদ্ধ শিল্পাঞ্চল ছিল। শতাধিক চাতালকল ও অটো রাইস মিল হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস ছিল। কিন্তু অব্যাহত ভাঙনের কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়েছে অথবা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অসংখ্য পরিবার বসতভিটা, ব্যবসা ও জীবিকার উৎস হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বছরের পর বছর মানুষ শুধু আশ্বাসই পেয়েছে। এখন পানিশ্বরকে রক্ষায় স্থায়ী ও টেকসই নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।”

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের সরাইল শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মহসিন কবির শিহাব জানান, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (পার্ট-১)’-এর আওতায় পানিশ্বর এলাকায় ১ হাজার ৩৫০ মিটার নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রস্তাব পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে ভাঙন ঠেকাতে কিছু জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে।

সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেন, “পানিশ্বর এলাকার নদীভাঙনের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উপজেলা পরিষদের সীমিত বরাদ্দ দিয়ে এ ধরনের ভয়াবহ ভাঙন মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরুরি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙন চললেও এখনো কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে শুধু চারটি গ্রাম নয়, পানিশ্বরের অবশিষ্ট জনপদ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় অর্থনীতিও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

, বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ