বুধবার, ১৯শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ,৪ঠা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

এর সর্বশেষ সংবাদ

সিইপিএ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে বাংলাদেশ ও কোরিয়ার যৌথ কর্মপরিকল্পনা

তরিকুল ইসলাম আপন, দক্ষিণ কোরিয়া: বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বেসরকারি খাতের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে যৌথ কর্মপরিকল্পনা দল গঠনে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।

দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) নিয়ে আলোচনা সম্পন্ন হওয়ার পর চুক্তির সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মঙ্গলবার দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী জুং-সুং পার্কের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়।

বৈঠকে সিইপিএ চুক্তির অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া, শুল্কব্যবস্থার সংস্কার, আধুনিক প্রযুক্তিতে যৌথ সহযোগিতা এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক সম্প্রসারণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রস্তাবিত যৌথ কর্মপরিকল্পনা দলে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিরা থাকবেন। দলটি অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ, ব্যবসা পরিচালনা সহজীকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করবে।

বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সিইপিএ নিয়ে আলোচনা সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশ ও কোরিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও গতিশীল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রচলিত বস্ত্র ও তৈরি পোশাকনির্ভর বাণিজ্যিক সম্পর্কের বাইরে গিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর ও বহুমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সহযোগিতার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে ইলেকট্রনিকস ও অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি, জাহাজ নির্মাণ ও সামুদ্রিক শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল ও সৃজনশীল শিল্পের কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। পাশাপাশি জ্বালানি, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পণ্য পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা, আধুনিক উৎপাদনশিল্প এবং অবকাঠামো খাতে কোরীয় বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়েও কোরীয় প্রতিনিধিদের অবহিত করেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে মূলধন প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ডিজিটাল রূপান্তর ও স্বয়ংক্রিয়করণ, ইলেকট্রনিকস শিল্পের কাঁচামালের ওপর শুল্কহার ২৬ শতাংশ থেকে শূন্যে নামিয়ে আনার উদ্যোগ এবং শুল্ক ও বন্দর কার্যক্রম সহজীকরণ।

কৌশলগত অবকাঠামো, জ্বালানি ও অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক বিনিয়োগ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার-টু-সরকার এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বভিত্তিক বিনিয়োগ মডেল সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী।

অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী জুং-সুং পার্ক বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন সমস্যা ও বিনিয়োগসংক্রান্ত আগ্রহের বিষয় তুলে ধরে তিনি জানান, এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সহজ করা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সমস্যাগুলোর একটি সমন্বিত তালিকা বাংলাদেশ সরকারের কাছে দেওয়া হবে।

কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় তিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিনিয়োগ আলোচনা

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় তিন প্রতিষ্ঠান হুন্দাই গ্লোভিস, হানওয়া ওশান এবং স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শিল্প ও অবকাঠামো খাতে ব্যবসায়িক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

হুন্দাই গ্লোভিসের প্রেসিডেন্ট লি কিউ-বকের সঙ্গে বৈঠকে পণ্য পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা, বন্দর উন্নয়ন এবং মোটরযানশিল্পের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ পক্ষ থেকে দেশে পণ্য পরিবহনকেন্দ্র, বন্দর, অর্থনৈতিক ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল, মোটরযানশিল্পের সরবরাহব্যবস্থা এবং আধুনিক পণ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হয়।

হুন্দাই গ্লোভিস বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা অনুসন্ধানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নিতে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকরী পর্যায়ের দল গঠনে সম্মত হয়েছে।

হানওয়া ওশানের সঙ্গে বৈঠকে জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিকায়ন, সামুদ্রিক অবকাঠামো এবং ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট স্থাপন নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশে জাহাজ মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়ন কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তাব দেয়। পরবর্তী সময়ে উচ্চমূল্য সংযোজিত জাহাজ নির্মাণ ও অন্যান্য সামুদ্রিক শিল্পে কার্যক্রম সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও তুলে ধরে। এ বিষয়ে পরবর্তী কারিগরি আলোচনা এবং প্রতিনিধিদলের সম্ভাব্য সফরের মাধ্যমে কার্যক্রম এগিয়ে নিতে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।

অন্যদিকে, স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের প্রেসিডেন্ট কিম উ-জুনের সঙ্গে বৈঠকে ইলেকট্রনিকস উৎপাদন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল সংযোগ এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

বৈঠকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বাংলাদেশে স্যামসাংয়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান চালুর সম্ভাবনা অনুসন্ধানের আহ্বান জানান। স্যামসাংয়ের প্রেসিডেন্টও বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধানে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

প্রযুক্তি গবেষণা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে উদ্যোগ

প্রযুক্তিগত সহযোগিতা জোরদারের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল এলজি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাকেন্দ্র পরিদর্শন করে। সেখানে আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিল্পের বিকাশে যৌথ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

পাশাপাশি স্যামসাংয়ের নেটওয়ার্ক প্রযুক্তি ও অর্ধপরিবাহী শিল্পে বাংলাদেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থায় আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিনিধি দলে যারা ছিলেন

বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার গনি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

সফর ও বৈঠক শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সিইপিএ-পরবর্তী সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপ দিতে বাংলাদেশ কোরিয়া সরকার ও দেশটির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিল্পের বহুমুখীকরণ, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক মূল্য সংযোজন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোই দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী পর্যায়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রস্তাবিত যৌথ কর্মপরিকল্পনা দল গঠন এবং কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাংলাদেশে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে। বিশেষ করে সিইপিএ বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রচলিত খাতের বাইরে নতুন শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Tumblr
Telegram

বিভাগের জনপ্রিয় সংবাদ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যায়যায়কাল এর সর্বশেষ সংবাদ