
যায়যায়কাল ডেস্ক: ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেছিলেন, ম্যাচ নিজেদের পক্ষে না থাকলেও শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার দৃঢ়তা ও মানসিকতা তার দলের আছে। কোচের কথাকে সত্যি প্রমাণ করে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে আর্জেন্টিনা। দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও চরম নাটকীয়তায় ভরা ম্যাচে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
এর আগে বিশ্বকাপ ইতিহাসে কখনোই দুই গোলে পিছিয়ে থাকা ম্যাচ জিতে ফিরতে পারেনি আর্জেন্টিনা। টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে আজ তাই নিজেদের ইতিহাসটা নতুন করেই লিখতে হতো মেসির দলকে। সেটি বোধহয় এর চেয়ে নাটকীয়ভাবে করা সম্ভব ছিল না স্কালোনির দলের পক্ষে। পুরো দ্বিতীয়ার্ধই ছিল একের পর এক উত্তেজনাকর মুহূর্তে ঠাসা।
প্রথমার্ধের গোল শোধে যখন মরিয়া আর্জেন্টিনা, তখনই আচমকা এক প্রতিআক্রমণে ৫৭ মিনিটে গোল করে বসেন মোস্তাফা জিকো। নিজেদের অর্ধ থেকে প্রায় গোটা আর্জেন্টিনা দলকে কাটিয়ে অসাধারণ সলো রান নিয়ে আর্জেন্টিনার অর্ধে আসেন হাইসেম হাসান। সেখান থেকেই বল পেয়ে গোল করেন জিকো। পুরো মিশর যখন উল্লাসে ব্যস্ত, তখনই ভিএআর জানালো, গোলের বিল্ড-আপে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পায়ের উপর আঘাত করেন মারওয়ান আতিয়া। ফলাফল, বাতিল হয়ে যায় মিশরের সেই গোল।
তবে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের এই স্বস্তি বেশিক্ষণ টেকেনি। ঠিক ১০ মিনিট পর আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারদের অলস ডিফেন্সের সুযোগ নিয়ে আবারও দারুণ প্রতিআক্রমণে ওঠে মিশর। এবারও গোলের কেন্দ্রে ছিলেন সেই হাইসেম হাসান, গোলদাতাও সেই মোস্তাফা জিকো। দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে মেসিদের মুখে তখন রাজ্যের অবিশ্বাস।
ব্রাজিলের পর আরেক লাতিন পরাশক্তি আর্জেন্টিনারও বিদায়ঘণ্টা বাজার শঙ্কা যখন গোটা স্টেডিয়ামজুড়ে, তখনই হঠাৎ যেন নিজেদের ফিরে পায় চ্যাম্পিয়নরা। গোলের দেখা পেতে মরিয়া স্কালোনি ততক্ষণে নামিয়ে দিয়েছেন লাউতারো মার্টিনেজ ও নিকো গঞ্জালেজকেও। অবশেষে ৭৯ মিনিটে গোলের খাতা খোলে আলবিসেলেস্তেরা। মেসির ক্রসে শক্তিশালী হেডে এক গোল শোধ দেন ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো।
ম্যাচের বাকি ১০ মিনিট, তখনো এক গোলে পিছিয়ে আর্জেন্টিনা। তবে দলকে সমতায় ফেরাতে এরপর মেসি সময় নিয়েছেন মাত্র পাঁচ মিনিট। ৮৪ মিনিটে বক্সের ভেতরে জটলা থেকে বাঁ পায়ের রকেট শটে টুর্নামেন্টে নিজের ৮ম গোলের দেখা পান প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিস করা মেসি। এই নিয়ে টানা ৯টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোলের দেখা পেলেন মেসি, বিশ্বকাপ ইতিহাসে যে রেকর্ড নেই আর কারোর।
চোখের পলকে দুই গোলের লিড হারিয়ে যেতে দেখে যখন হতভম্ব মিশর, তখনই আফ্রিকান দেশটির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে আর্জেন্টিনা। স্টপেজ টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে লাউতারো মার্টিনেজের মাপা শটে বুদ্ধিদীপ্ত হেডে গোল করে ৩-২ গোলের জয় নিশ্চিত করেন এনজো ফার্নান্দেজ। পুরো ম্যাচে দারুণ খেলা গোলরক্ষক শোবিরের তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।
এর আগে আটলান্টায় ভরা আর্জেন্টাইন গ্যালারিকে স্তব্ধ করে ম্যাচের মাত্র ১৪ মিনিটেই এগিয়ে যায় মিশর। মারাওয়ান আতিয়ার দুর্দান্ত ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে মিশরকে এগিয়ে নেন ডিফেন্ডার ইয়াসির ইব্রাহিম।
তবে এরপর ম্যাচে ফেরার অন্তত তিনটি সুবর্ণ সুযোগ পেলেও একটিকেও গোলে পরিণত করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। সবচেয়ে বড় সুযোগটি পেয়েছিলেন অধিনায়ক মেসিই। ১৮ মিনিটের মাথায় নিকোলাস টালিয়াফিকোকে বক্সে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় বর্তমান ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা। কিন্তু মেসির কি বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতায় ঠেকিয়ে দেন শোবির।
দ্বিতীয় সুযোগটি আসে ২৭ মিনিটে। মাঠের ডান পাশ থেকে বক্সে দুর্দান্ত এক ক্রস ফেলেছিলেন রদ্রিগো ডি পল। গোলের খুব কাছে ফাঁকায় দাঁড়ানো অবস্থায়ও সেটিকে গোলে পরিণত করতে পারেননি অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এটিও দারুণ দক্ষতায় ফিরিয়েছেন শোবির।
তৃতীয় সুযোগ মিসের দায়ভার হুলিয়ান আলভারেজের। লাউতারো মার্টিনেজের জায়গায় প্রথম একাদশে সুযোগ পাওয়া আলভারেজ হতাশ করেছেন ৩৮ মিনিটে। টালিয়াফিকোর বাড়ানো বলে গোল করতে কেবল শোবিরকে পরাস্ত করলেই হতো। আলভারেজ পা ছুঁইয়েছিলেন, কিন্তু অসাধারণ রিফ্লেক্সে সেটি আবারও ঠেকিয়ে দেন শোবির।
ম্যাচের শেষ দিকে উত্তেজনায় বেশ কয়েকটি হলুদ কার্ড দেখেছেন মিশরের খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের সদস্যরা। কোয়ার্টারে মেসিদের প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড-কলম্বিয়া ম্যাচের জয়ী দল।











